মতামত

জননেত্রীর জন্মদিনে

ফারজানা হুরী::

শুভ জন্মদিন প্রিয় জননেত্রী-আপনার আলোয় আমরা ধন্য। ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী-আমাদের ভালো রাখার জন্য।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা, দেশের দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৭তম জন্মদিন ২৮ সেপ্টেম্বর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের ৫ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শেখ হাসিনা। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকারি ইন্টামেডিয়েট গার্লস কলেজের ছাত্রী সংসদের সহসভাপতি ছিলেন। তিনি এই কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছর সভাপতি ছিলেন। শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একজন সদস্য এবং ছাত্রলীগের রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই শেখ হাসিনা সকল গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোটবোন শেখ রেহানা সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান।

সংস্কৃত প্রবচন আছে-রত্ন কর্ষতি পুরঃপরমেক/স্তদগতানুগতিকোন মহার্যৎ-অর্থাৎ একজনই আগে পথ তৈরি করে দেন। পরে সে পথ দিয়ে যাত্রায়াত করার লোক দুর্লভ হয় না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর তৈরি করা পথে শেখ হাসিনা চলছেন, যদিও তাঁর পথচলা সহজ নয়, বেশ কঠিন।

একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছিল; এখন শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে হয়েছে পদ্মা সেতু। বাঙালি তো মাথা নোয়াবার জাত নয়। শেখ হাসিনার সাহস প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।

ঐতিহাসিক পদ্মা সেতু নির্মাণ থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি, একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্য সম্পন্ন করা, সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সমুদ্রে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ব্লু ইকোনমির নতুন দিগন্ত উন্মোচন, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন ও ছিটমহল বিনিময়, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট সফল উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে মহাকাশ জয়, সাবমেরিন যুগে বাংলাদেশের প্রবেশ, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন নতুন উড়াল সেতু, মহাসড়কগুলো ফোর লেনে উন্নীত করা, এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত, দারিদ্র্যের হার হ্রাস, মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭৪ বছর ৪ মাসে উন্নীত, যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন, সাক্ষরতার হার ৭৫.৬০ শতাংশে উন্নীত করা, বছরের প্রথম দিনে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে নতুন বই পৌঁছে দেওয়া, মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করা ও স্বীকৃতি দান, মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় স্থাপন, প্রত্যেকটি জেলায় একটি করে সরকারি/বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ, নারী নীতি প্রণয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ, ফাইভ-জি মোবাইল প্রযুক্তির ব্যবহার চালুসহ অসংখ্য ক্ষেত্রে কালোত্তীর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। এ সময় বদলে দিয়েছে বাংলাদেশকে।

এক নজরে যদি শেখ হাসিনা সরকারের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে কাজগুলো দেখি তা হবে নিম্নরূপ:-
• ২০০৬ সালে সরকারি ওয়েবসাইট ছিল মাত্র ৯৮টি। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৫২ হাজার ২০০টি।
• ২০০৬ সালে বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা সুবিধা ভোগীর সংখ্যা ছিল ৫ লক্ষ ২৪ হাজার জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাড়িয়েছে২৫ লক্ষ ৯৮ হাজার জন।
• ২০০৬ সালে ওয়ান স্টপ সেন্টার ছিল মাত্র ২টি। তা বেড়ে দাড়িয়েছে৮ হাজার ৮শ ৫৮টি।

• ২০০৬ সালে দানাদার শস্যের উৎপাদন ছিল মাত্র ২ কোটি ৭৭ লক্ষ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৪ কোটি ৭৭ লক্ষ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন।
• ২০০৬ সালে মোবাইল ফোনের সিম ছিল ১৯ মিলিয়ন। তা বেড়ে দাড়িয়েছে .৫৩.১৮৩ মিলিয়ন।
• ২০০৬ সালে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ছিল মাত্র ৫৫%। তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৪৩.৭% বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িয়েছে ৯৮.৮%।

• ২০০৬ সালে লবণ উৎপাদন ছিল ৮.৫৪ লক্ষ মেট্রিক টন।২০২৩ সালে লবণ উৎপাদন দাড়িয়েছে ২৩.৪৮ লক্ষ মেট্রিক টন।

• ২০০৬ সালে চা উৎপাদন ছিল ৩৯ মিলিয়ন কেজি। বর্তমান সরকারের সময়ে চা উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িয়েছে ৮১ মিলিয়ন কেজি।

• ২০০৬ সালে পোল্ট্রির সংখ্যা ছিল ১৮ কোটি ৬ লক্ষ ২২ হাজার। বর্তমান সরকারের সময়ে তা দাড়িয়েছে ৫২ কোটি ৭৯ লক্ষ ১৯ হাজার।
• ২০০৬ সালে মোট মৎস্য উৎপাদন ছিল ২১.৩০ লক্ষ মেট্রিক টন। বর্তমান সরকারের সময়ে বেড়ে দাড়িয়েছে ৫৩.১৪ লক্ষ মেট্রিক টন।
২০০৬ সালে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল মাত্র ৯টি। বর্তমান সরকারের সময়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৯৬টি।

ক্টিসিবির মাধ্যমে ১কোটি পরিবারকে স্বল্প মূল্যে বর্তমানে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করছে সরকার। ফলে উপকৃত হচ্ছে নি¤œ আয়ের প্রায় ৫ কোটি মানুষ।

২০০৬ সালে ওয়ার্কিং ফোর্সে মহিলাদের অংশগ্রহন ছিল মাত্র ২১.২%। বর্তমান কারের সময়ে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩.৪৪%।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এখন পর্যন্ত ১৩লাখ গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে সরকার। ফলে ভাগ্য বদলে গেছে প্রায় ৫০ লাখ অসহায় মানুষের।

বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ২৭ হাজার ডিজিটাল সেন্টার থেকে প্রতি মাসে ৭০ লাখ মানুষকে সেবা দিচ্ছে সরকার ।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে সরকার।
২০০৬ সালে শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ছিল মাসিক ১৪৬২ টাকা বর্তমান সরকারের সময়ে তা দাড়িয়েছে ৮৩০০ টাকা।

২০০৬ সালে কৃষি উৎপাদন ছিল ২ কোটি ৬১ লক্ষ টন। বর্তমান সরকারের সময়ে বৃদ্ধি পেয়ে তা দাড়িয়েছে ৯ কোটি ৮০ লক্ষ মেট্রিক টন।
২০০৬ সালে বেকারতে¦র হার ছিল ৬.৭৭% বর্তমানে তা কমে দাড়িয়েছে ৩.৬%।

স্মার্ট প্রজন্ম গড়তে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সরকার। আউট সোর্সিং করে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ডলার আয় করছে প্রায় ৬ লাখ ফ্রিল্যান্স্যার। বদলে যাচ্ছে কর্ম সংস্থান।

সরকার বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের সম্মানী ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২০,০০০ টাকায় উন্নীত করেছে। যার ফলে উপকৃত হচ্ছে ২ লাখ বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার।

শিশুর সঠিক বিকাশকে অগ্রাধিকার দিয়ে নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ৩ মাস থেকে ৬মাসে উন্নীত করা হয়েছে।

২০০৬ সালে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ছিল ২১ হাজার ৫শত কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ২ লক্ষ ৭৪ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা।

২০০৬ সালে সামাজিক নিরাপত্তাখাতে উপকারভোগী ছিল ২১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৩৫৬জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ১ কোটি ৮১ লক্ষ ২৩ হাজার ৫৫৪ জন।

’৭৫-এর পর ভারতে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে শেখ হাসিনা ’৮১-এর ১৭ মে দেশে ফেরেন আওয়ামী লীগের নতুন নির্বাচিত সভাপতি হিসাবে। সেদিন যেন নির্বাসন থেকে বাংলাদেশ অস্তিত্বে ফিরল (Bangladesh from exile to existence)।

এ সময় কবি হাসান হাফিজুর রহমান শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ।’ ’৯১-এর নির্বাচনি বিপর্যয়ের পর শেখ হাসিনা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন;
কিন্তু জননী সাহসিকা বেগম সুফিয়া কামাল তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমাকে থাকতে হবে এবং বাংলাদেশকে বাঁচাতে হবে।’ শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত পালটিয়েছিলেন; তিনি ছিলেন বলেই বাংলাদেশের অর্জন এখন সারা দুনিয়ার নজরকাড়া। নজর কেড়েছেন তিনিও। তিনি বিশ্বনেতার তালিকাভুক্ত।
শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বে চার দশকের বেশি; সরকারের নেতৃত্বে প্রায় সতেরো-আঠারো বছর।

উল্লেখ্য, তার নেতৃত্বেই ’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরে। তার ওপর দিয়ে ঝড়ঝাপটা কম যায়নি। জীবনের ওপর আঘাত এসেছে উনিশ-কুড়ি বার। তার বেঁচে থাকায় অলৌকিকত্ব আছে। তবে আমরা ভাগ্যবান যে, আমরা তার নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হইনি।

প্রিয় জননেত্রী শেখ হাসিনা- জন্মদিনে বলছি আজ, শুভ তোমার জয়ন্তী। জয়তু শেখ হাসিনা। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।

লেখক: ফারজানা হুরী, কলামিস্ট, নারীনেত্রী ও সংগঠক।

Please follow and like us:

Related Articles

Back to top button